Thursday, 28 April 2016

গোঁফ চুরি 



ইদানীং গোপাল ইয়া মোটা গোঁফ রেখেছে। পুরুষ্টু গোঁফ থাকলে লোকে মান্যি গন্যি করে। বাড়ির সব্বার আপত্তি এই পেল্লাই গোঁফে, তার বান্ধবী বিনি'র তো দু চোখের বিষ। কিন্তু গোপালের সাফ কথা, রেললাইনে বডি দেবো গোঁফ দেবো না।
.
থানার ডিউটি অফিসার তার লিখে নিয়ে যাওয়া দরখাস্তের একটা কপিতে সই করে, নাম্বার লিখে, সিল দিয়ে ফেরৎ দিয়ে দিলেন।
গোপাল থানা থেকে বেরিয়ে যাচ্ছে, এমন সময় বড়বাবু তাঁর বিশাল বডি নিয়ে থানায় ঢুকলেন। গোপালের মুখোমুখি হতেই বললেন, হুম, বেড়ে গোঁফ তো । তা কি করা হয়?
-- চাকরি না মানে চাকরির জন্য দরখাস্ত।
বড়বাবু একজন কনস্টেবলকে বললেন, একে বসিয়ে রাখ ।
গোঁফের গর্বে গর্বিত গোপাল ভাবল, গোঁফ কি করে মেনটেন করতে হয় বড়বাবু বোধহয় তারই টিপস নেবেন।
.
বড়বাবু নিজের চেম্বারে ঢুকেই চেঁচামেচি শুরু করে দিলেন। বাইরে একটা চেয়ারে গোপালকে বসতে বলা হলো।
চারদিন আগেই এই থানা এলাকায় একটা খুব বড় ডাকাতি হয়েছে এক ব্যবসায়ীর বাড়িতে। পুলিশ কাউকে এখনও পর্যন্ত গ্রেপ্তার করতে পারেনি।
এস পি বড়বাবুকে তলব করেছিলেন। সাফ সাফ বলে দিয়েছেন, চব্বিশ ঘন্টার মধ্যে অন্তত একজন ডাকাতকে না অ্যারেস্ট করতে পারলে, চাকরি ঘচাং ফু হয়ে যাবে। উপরমহল নাকি টগবগ করে ফুটছে।
তারপর বড়বাবু যা বললেন শুনে গোপালের অজ্ঞান হওয়ার জোগাড়।
-- অই যে গুঁফো ছেলেটা, যাকে বসিয়ে রাখতে বললাম, ওকেই চালান করে দাও। বেশ একটা পেল্লাই গোঁফ আছে। ডাকাত বললে লোকের মনে ওইরকম গুঁফো একটা মুখের ছবিই ভেসে ওঠে।
শুনেই গোপালের ভয়ে পটি-টটি সব পেয়ে গেল। কি বলছে কি বড়বাবু? তাকে গ্রেপ্তার করবে? সে ডাকাত? সাধের গোঁফ আজ তাকে ডাকাত বানিয়ে দিলো?
-- এই যা ওকে লক আপে ভরে দে। আগে এস পি সাহেবকে খবরটা দিই তারপর মিডিয়াকে দেবো।
তারপরেই বড়বাবু ফোন করলেন এস পি সাহেবকে
-- স্যার আমি আইসি তফাদার বলছি, একজনকে ধরেছি স্যার। অ্যাঁ? কি বলছেন? ধরা পড়ে গেছে? টাকা -গয়না সমেত? ও আচ্ছা স্যার, হ্যাঁ স্যার, স্যার...
ফোন রেখে দিয়ে বড়বাবু হাঁকলেন, অ্যাই ওই গুঁফো ছোকরাটাকে ভাগিয়ে দে। ডাকাতের দলটা ঝাড়খন্ড বর্ডারে ধরা পড়ে গেছে।

...শুনেই চোঁ চা দৌড় লাগালো গোপাল। ওহ, কানের পাশ দিয়ে বেরিয়ে গেল গুলিটা। আর একটু হলেই জেলের ঘানি... একটা সেলুন দেখেই ঢুকে পড়ল গোপাল.. চেয়ারে বসে বলল, গোঁফটা উড়িয়ে দাও।

আশ্বিনের শারদপ্রাতে 



"মনে আছে তোমার, ফুলশয্যার রাতে লাথি মেরেছিলে আমায়!" সৃজনীদেবীর দিকে তাকিয়ে আচমকা বলে উঠলেন সাত্যকিবাবু। পেশায়ে প্রফেসর সাত্যকিবাবু বছর ছয়েক হয়েছে অবসর নিয়েছেন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। আজ হঠাতই পুরোনো অ্যালবাম দেখতে দেখতে স্মৃতির মণিকোঠা থেকে একটা মুক্তো ঝরে পরলো।
"আমরন, মাঝরাতে একি ন্যাকামি!" আকাশ থেকে পরলেন সৃজনীদেবী।
এক ঝলক বরকে দেখে নিয়ে বললেন "এই মাঝেরাতে ধুলো ঘাঁটছো, এরপর হাঁচলে আমি কিন্তু সোজা তোমায়ে বের করে দেব।" বলেই হজমের ওষুধের শিশির ঢাকনাটা চেটে নিলেন তিনি।
"আস্তে কথা বলো, পাশের ঘরে ছেলে, ছেলের বউ ঘুমাচ্ছে।" আহতগলায়ে কথাগুলো বলে অ্যালবামটা মুড়ে ঢুকিয়ে ফেললেন সাত্যকিবাবু।
"তা তুমিই বা মাঝরাতে ঢঙ করছ কেন? উঠে হাত পা ধুয়ে শোও না। আদিখ্যেতা যত।" পুনরায় মুখ ঝামটা সৃজনীদেবীর। কিন্তু এবার ভলিউমটা একটু আস্তে।
"হুম" হাত পা ধুয়ে এসে পাশ ফিরে শুয়ে পরলেন সাত্যকিবাবু। মনটা বিষাদে ভরে গেছে। প্রত্যেক কথায়ে ঝগড়া করাটা সৃজনীর স্বভাব। বিরক্ত লাগে আজকাল। আচ্ছা এই বয়েসে এসে ডিভোর্স চাওয়াটা কি সমীচীন? নাহ্, ৬ বছরের ছোটো নাতনিটার উপর কি প্রভাব পরবে। সে স্কুলে গিয়ে বলবে আমার দাদান-ঠাম্মামের ডিভোর্স হয়ে গেছে, সে বিশাল লজ্জার ব্যাপার হয়ে যাবে। তার থেকে সন্নাসী হয়ে যাবেন। একা থাকতে হলেই এই ভদ্রমহিলা বুঝবেন কত চালে কত ধান। ইয়ে মানে কত ধানে কত চাল। কথাটা ভেবেই জিভ কাটলেন সাত্যকিবাবু। ভাগ্যিস জোরে বলেননি। জোরে বললেই আরেক প্রস্থ জ্ঞান বাঁধা ছিলো কপালে। শুয়ে শুয়ে টের পেলেন পাশে বিশমণি লাশটা উঠলো, এবার রাজ্যের গল্প বলবে, চুপচাপ চোখ বুজলেন সাত্যকিবাবু।
"এই জানো তো পাশেরবাড়ির বল্টুর বউটা না.... আরে এই শোনোনা।" পাশে শুয়েই বলতে শুরু করলেন সৃজনীদেবী।
"বলি এই বুড়ো ঘুমোচ্চো?" ঝামটে উঠলেন সৃজনীদেবী।
সাত্যকিবাবুর কোনো শব্দ নেই।
গায়ে হাত দিয়ে একবার ঠেললেন "ঘুমোচ্চো! "।
নাহ্ সাত্যকিবাবু ঘুমিয়ে পরেছেন। মুখটা বিকৃত করে পাশে ফিরে চোখ বুজলেন সৃজনীদেবী। হঠাত অভিমানে গলাটা ব্যথা ব্যথা করতে লাগলো সৃজনীদেবীর। আর কখনো সাত্যকির সাথে কথা বলবেন না তিনি। সত্যি ৩৬-৩৭ বছর হয়ে গেল বিয়ে হয়েছে, কি পেয়েছেন তিনি এই বিবাহিত জীবনে? সবাই বলে শিবের মতো বর। আরে কেউ দেখতে গেছে শিব বর হিসেবে কেমন! সবকথায়ে হু হাঁ, রসকষ নেই শরীরে। মাঝে মাঝে টিভির অ্যাডভার্টাইসগুলো দেখলে মনে হয় খাইয়ে দেবেন ওষুধ। তাতে যদি হেলদোল আসে। চোখটা ভিজে এলো সৃজনীদেবীর। বিছানা থেকে নেমে জানলার কাছে গিয়ে দাঁড়ালেন। দেখো, কোনো পরিবর্তন নেই। পাশ থেকে বউ যে উঠে গেল কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই। নিশ্চিন্তে নাক ডাকছে। কেউ যদি বউকে চুরি করেও নিয়ে যায় তাও ঘুমাবে। বললে বলবে 'এই মাল আর কে নেবে!' চোখের জলটা আর বাঁধা মানছে না। এখন মনে হয় শুরুর বছরগুলো কি আরামেই না কেটেছিল। প্রথমে ৭ বছরের দীর্ঘ প্রেম, তারপর বিয়ে। তখন কত কথা রিটায়ারমেন্টের পর দোঁহে মিলে ঘুরতে যাবো, আর আসলে কি হচ্ছে, ঘরের মধ্যে পিষছে। গত ৩-৪ বছর পুজোতেও বেরোনো হয়না।
জানলাটা খুলে দিলেন সৃজনীদেবী। আকাশটা লাল হয়ে আছে। বৃষ্টি হবে মনে হয়। তা হোক, এখন হয়ে যাক, পুজোয়ে না হলেই হলো। যা গরম ছুটেছে। আশ্বিন পরে গেলো, কিন্তু ঠান্ডার আমেজটা আসেনি এখনো। রোজই প্রায় এ.সি. চালাতে হচ্ছে। বাবুর আবার ঠান্ডার ধাঁত।
হঠাতই কোমরে হাতের স্পর্শ পেলেন সৃজনীদেবী। পিছন থেকে ভরাট গলা বলে উঠলো "ঘুম আসছে না?" মনটা ভরে গেল সৃজনীদেবীর। যাক টের পেয়েছে। চুপ করে থাকলেন তিনি। "একি চোখে জল!" আবার বললো ভরাট কন্ঠ।
ইশ মাঝেরাতে ঢঙ দেখ মিনসের। সৃজনীদেবীকে বুকে টেনে নিলেন সাত্যকিবাবু। অভিমানী সৃজনীদেবীর মধ্যে তখন নতুন বউয়ের লজ্জা।
বরের বুকে মুখটা গুঁজে হেসে ফেললেন তিনি। "মনে আছে, ফুলশয্যা রাতে কানও মুলে দিয়েছিলাম।"
"হ্যাঁ লাল হয়ে গেছিল কানটা।" সাত্যকিবাবু বললেন।
"আর সেই জন্যে বারবার আমার গাল টিপে টিপে লাল করে দিচ্ছিলে।" লজ্জায়ে লাল হয়ে গেছেন সৃজনীদেবী।
সৃজনীদেবীর চোখটা মুছিয়ে কপালে ঠোঁট ঠেকালেন সাত্যকিবাবু।
আচমকাই সশব্দে হেসে উঠলেন সৃজনীদেবী।
-"কি হলো?"
-"কিছু না।"
-"না বলো।"
-"বললাম তো, কিছু না।" তখনও হাসছেন সৃজনীদেবী।
-"ছাড় বলতে হবেনা।" আহত কন্ঠে বললেন সাত্যকিবাবু।
"বাবু হওয়ার পর, নার্সিংহোমে ঢুকেই তুমি প্রথম আমায়ে বলেছিলে ব্যস এই একটাই বাচ্চা, আর না। এভাবে আমায়ে দেখতে কষ্ট হচ্ছে তোমার।" গভীরভাবে সাত্যকিকে জড়িয়ে নিলেন সৃজনীদেবী।
হেসে ফেললেন সাত্যকিবাবুও। খানিক চুপচাপ দুজনেই। বাইরে বৃষ্টিটা নামছে আস্তে আস্তে।
নীরবতা ভেঙ্গে মুখ খুললেন সৃজনীদেবী। "কাল তো মহালয়া, আমায়ে কাল বেড়াতে নিয়ে যাবি সতু?" আজ এত বছর পরে, আবার সেই পুরোনো সম্মোধন ঠোঁটে আসছে সৃজনীদেবীর।
"বেড়াতে? না বেড়াতে যাব না। তার চেয়ে ঘরে বসে গঙ্গার তর্পণ দেখব কাল সারাদিন।" স্ত্রীকে বাহুপাশ থেকে মুক্ত করলেন সাত্যকিবাবু।
ঝংকার দিয়ে উঠলেন সৃজনীদেবী। "ছাড় তো, ন্যাকামি বাদ দাও। শুতে চলো। মহালয়া শুনতে হবে ভোরে উঠে।" বিরক্ত কন্ঠে বলে উঠলেন সৃজনীদেবী।
স্ত্রী কে আটকাতে গিয়েও আটকালেন না সাত্যকিবাবু। জানলার দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসলেন শুধু। কান ফাটানো শব্দে আওয়াজ উঠলো 'কড় কড় কড়াত'
"ও মাগো!" চমকে উঠে সাত্যকিবাবুকেকে জাপটে ধরলেন সৃজনীদেবী।
নিজের 'সৃ' কে আরো একবার বুকের মধ্যে টেনে নিতে নিতে 'সতু' বললেন "কোথায়ে যাবি বল?"

পাশে ছেলে ছেলের বউয়ের ঘর থেকে বেজে উঠলো "আশ্বিনের শারদপ্রাতে বেজে উঠেছে........"

ভালোবাসা আর গনতন্ত্র

দিনটা এসেই পরল শেষমেশ।বেশ কদিন ধরেই এই দিনটার জন্য ভেতরে ভেতরে বেশ উত্তেজিত ছিল পরমা।সাংবাদিক হিসেবে জীবনের প্রথম বড় কন্সাইনমেন্ট।অনেক প্রস্তুতিও নিয়ে রেখেছে এটার জন্য ও।কিন্তু তাও দিনটা যত এগিয়ে এসেছে একটা অজানা ভয় কাজ করেছে ওর মধ্যে।পেটের মধ্যে মাঝে মাঝে গুলিয়ে উঠেছে যত ভেবেছে।ছোটবেলায় পরীক্ষার আগে এরকম ওর হত।তবে এই ব্যাপারটাকে একটা চ্যালেঞ্জ হিসেবেই নিয়েছে পরমা।বিশেষ করে চ্যানেলের এক্সিকিউটিভ হেড যখন কয়েকজন সিনিয়ার জার্নালিস্ট থাকা সত্ত্বেও ওর ওপর ভরসা রেখেছেন,তখন সেই ভরসার দায় রাখারও একটা ব্যাপার আছে।
কয়েকদিন আগে যখন সিনিয়ার এডিটার এসে বলল,আমরা সিপিআই(মাওবাদী)র পলিটব্যুরোর শীর্ষ নেতা ভেঙ্কটেশের লাইভ ভিডিও ইন্টারভিউ নেওয়ার চেষ্টা করছি,তখন শুনে অনেকেই শিউড়ে উঠেছিল।বিশেষ করে ইন্টারভিউটা যখন নিতে হবে দান্তেওয়াড়ার জঙ্গলে বসে,তখন তাতে আশংকার কারণ থাকে বইকি।কিন্তু কন্সাইনমেন্টটা কে পাবে তাই নিয়েও বেশ একটা চোরাস্রোত ছিল।কারণ চ্যালেঞ্জিং হলেও যে এটা করতে পারবে তার কেরিয়ারটাও অনেকটাই জাম্প পাবে।সারা ভারতবর্ষের মানুষ এই ইন্টারভিউটা চাক্ষুষ প্রত্যক্ষ করবে।কাজেই পরমা যখন এটা পেল,তখন অনেকেরই চোখ টাটিয়েছিল।কিন্তু ওর যোগ্যতা নিয়ে কেউ প্রশ্ন তুলতে পারে নি।অল্পদিনের মধ্যেই চ্যানেলে বেশ নজরকাড়া সাফল্য ওর রয়েছে। 
ওদের কয়েকজন লিঙ্কম্যানের মাধ্যমে ওই নেতাকে রাজি করানো গেছে ইন্টারভিউর জন্য।কিন্তু শর্ত একটাই,ইন্টারভিউটা নিতে হবে ওদের ডেরায় গিয়ে,অর্থাৎ গভীর জঙ্গলে আর রিপোর্টারের সাথে শুধু ক্যামেরাম্যান থাকবে আর কেউ নয়।এমনকি ওবি ভ্যানটাও ওই দুজনের একজনকেই চালিয়ে নিয়ে আসতে হবে।আর এই ব্যাপারে প্রশাসনের কেউ যেন হস্তক্ষেপ না করে।যদি কোনরকম সন্দেহ হয় তাহলে সাথে সাথে দুজনকেই হত্যা করা হবে।
নির্দিষ্ট দিনে আগে থেকে বলে দেওয়া একটা গ্রামে পরমা আর ক্যামেরাম্যান অভিজিত ভোর ছটার সময় গিয়ে পৌঁছাল।ওবি ভ্যানটা অভিজিতই চালিয়ে নিয়ে এসেছে।সময় আর স্থানটাও আগে থেকে বলে দেওয়া ছিল।সকাল ছটা হলেও এখনই রোদ উঠে গেছে।গরমটাও তাই কড়া লাগছে।ওরা দুজনে দাঁড়িয়ে আছে বেশ খানিকক্ষণ হবে,হঠাৎ দেখে দূর থেকে দুটো বাইকে করে দুজন দুজন করে চারজন আসছে।এসে পরমা আর অভিজিতের থেকে ওদের আইডি কার্ডটা দেখতে চাইল।দেখে সন্তুষ্ট হওয়ার পর ওদের দুজন ওবি ভ্যানে চেপে বসল।ওটা ওরাই চালিয়ে নিয়ে যাবে।আর বাকি দুজন পরমা আর অভিজিতের চোখ বেধে দিল একটা মোটা কাপড় দিয়ে।এখান থেকে এখন যা কিছুই হবে,সব নিয়ন্ত্রিত হবে ওদের দ্বারা।
পরমা আর অভিজিত দুজনে দুটো বাইকে চেপে বসল।বাইক স্টার্ট দিল।পরমা বুঝতে পারল ওবি ভ্যানটাও স্টার্ট দিয়েছে।বাইকে করে চলতে শুরু করল দুজনে এক অজানা গন্তব্যের উদ্দেশ্যে।কি আছে কপালে এখনো জানেনা কেউই।পরমা যদিও অনেক প্রিপারেশন নিয়ে নিয়েছে।বিশেষ করে রেড বুকটা এই কদিনে ভালোই রপ্ত করে নিয়েছে।তার সাথে কমিউনিস্ট ম্যানিফেস্টোটাও পড়ে নিয়েছে।বেশ অনেকটা যাওয়ার পর পরমা বুঝতে পারল এবার গ্রামের পথ শেষ হয়ে জঙ্গলের পথ শুরু হয়েছে।রোদটা আর ততটা গায়ে লাগছে না।চারিদিকের পরিবেশটাও শান্ত হয়ে এসেছে।
প্রায় ঘন্টাখানেক চলার পর বাইক থামল।সামনে থেকে হিন্দিতে আদেশ এলো নেমে পড়ুন।পরমা নেমে পরতেই ওর চোখ খুলে দেওয়া হল।দেখল অভিজিতও ততক্ষণে এসে পড়েছে।জঙ্গলের মাঝে একটু জায়গা পরিষ্কার করে কয়েকটা তাঁবু খাটিয়ে একটা ক্যাম্প মতন করা হয়েছে।গভীর জঙ্গলের মাঝে বলে সূর্যের আলো ঠিকমত পৌছচ্ছে না।তাই গরম ভাবটাও অনেকটা কম।আসেপাশের সবাই জলপাই রঙের পোষাক পরে কিছু না কিছু কাজ করে যাচ্ছে।কেউ বন্দুকের নল পরিষ্কার করছে,কেউ রান্না করছে,কেউ বা কাগজপত্র নিয়ে কিসব লেখালেখি করছে।কয়েকজন মেয়েও রয়েছে এদের মধ্যে।একজন এসে ওদের দুজনের জন্য দুকাপ চা দিয়ে গেল।চা খেতে খেতে পরমা নিজের কাগজপত্রগুলো গুছিয়ে নিচ্ছিল।প্রশ্নগুলো আগে থেকেই লিখে এনেছে।প্রশ্ন বাছাইও করতে হয়েছে খুব সাবধানে।এমন কোন অপ্রীতিকর প্রশ্ন করতে পারবে না যাতে উনি রেগে যান।কিন্তু সাংবাদিকতার পেশার খাতিরেই কিছু কিছু বিতর্কিত প্রশ্ন রাখতেই হয়েছে।
একটু পরে গামছায় মুখ ঢেকে একজন একটা তাঁবু থেকে বেরোলেন।সবাই সসম্ভ্রমে তার এগিয়ে আসার জায়গা করে দিল।উনি এসে আগে থেকে রাখা একটা টুলে বসলেন।পরমা অভিজিতকে ইশারা করতেই অভিজিত ক্যামেরা চালু করে দিল। 
ভেঙ্কটেশ রাও ওরফে সূর্য ওরফে দীপক আরো কত যে নাম রয়েছে প্রশাসনের ত্রাস এই ভদ্রলোকের তা প্রশাসনের নিজের কাছেও খবর নেই।উনি এসে পরমাকে দেখে একটু চমকে উঠলেন।তারপর নিজেকে সামলে নিয়ে পরিষ্কার বাংলায় বলে উঠলেন চা খেয়েছেন?এবার তাহলে শুরু করা যাক।গলার স্বরটা সত্যি সম্ভ্রম জাগানোর মত।এরকম ব্যারিটোন ভয়েস সচরাচর কারো হয় না।পরমা বলল আপনাকে বাংলায় প্রশ্ন করা যাবে?ভেঙ্কটেশ বললেন বাংলা হিন্দি ইংরেজি তেলেগু যে ভাষায় খুশি করতে পারেন।পরমা ভেবে দেখল সারা ভারতবর্ষের লোক এই ইন্টারভিউটা দেখছে।তাই বলল বেশ আপনাকে তাহলে বাংলা হিন্দি ইংরেজি মিশিয়ে প্রশ্ন করি?উনি বললেন জ্যাইসি আপকি মর্জি।প্রথম প্রশ্নটাই পরমা শুরু করল আপনার নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেন না কেন?সোজা চোখের দিকে তাকালেন ভদ্রলোক।অন্তর্ভেদী দৃষ্টি যেন।পরমাকে পুরোটা বুঝে নিতে চাইলেন চোখ দিয়ে তাকিয়েই।তারপর বললেন,আপনি কি মনে করেন নির্বাচনের মাধ্যমে এই দেশের কোন বেসিক পরিবর্তন করা সম্ভব?তাহলে সাধারণ মানুষ কেন সবকটা রাজনৈতিক দলের প্রতিই এতটা অনাস্থা প্রকাশ করে?নির্বাচন কমিশনকে পর্যন্ত আজ নোটা নামক একটা বোতাম রাখতে হচ্ছে ভোটিং বাক্সে।নির্বাচন ব্যাবস্থা যদি এতই ভালো হত,তাহলে সব কটা দল উন্নয়নের কথা বললেও আজকেও ভারতের আশি শতাংশ মানুষকে কেন চরম দারিদ্রের মধ্যে থাকতে হবে?ভোট দিয়ে সাধারণ জনগণের অবস্থার কোন পরিবর্তন কি হয়?
-আপনারা অংশগ্রহণ করে এই ব্যাবস্থা পাল্টাতে পারেন না?
-আমরা এই ব্যাবস্থাটাকেই পুরো ভেঙে ফেলতে চাই।আমরা জনগণের রাষ্ট্র চাই।এই বুর্জোয়া কাঠামোটাকে পুরোপুরি ধ্বংশ করেই যা আনা সম্ভব।সংগ্রামী জনগণের তাই দাবী।
-কোন জনগণের কথা বলেন আপনারা?প্রত্যন্ত অঞ্চলে থাকা ওই মুষ্টিমেয় সংখ্যক জনগণ?
-এই মুষ্টিমেয় সংখ্যক জনগণই কিন্তু ভারতের মূল কাঠামো।এরাই আসল শক্তি।এদেরকে অস্বীকার করে কেউ থাকতে পারবে না।
-
-
-
...প্রেসিডেন্সির গেট থেকে বেরিয়ে অর্ক আর সুজাতা কফি হাউসের দিকে চলেছে।অর্ক কোনও কথা বলছে না।সুজাতা লক্ষ্য করেছে ও দুদিন ধরেই চুপচাপ।অবশেষে সুজাতাই বলে উঠল,কি ব্যাপার তোমার বল তো?কথা বলছ না কেন?কি হয়েছে?
তারপরেও বেশ কিছুক্ষণ চুপ করে থাকার পর অর্ক বলে উঠল,নজন কৃষকের রক্তমাখা গুলিবিদ্ধ দেহ আমার চোখের সামনে ভাসছে সবসময়।আমার আর কিছু ভালো লাগছে না।আমার অস্থির অস্থির লাগছে।
তুমি কি নক্সালবাড়ির কথা বলছ?
হ্যা।তুমিই বলো কমিউনিস্ট পুলিশ মন্ত্রী কি করে কৃষকদের খুন করতে পারে?
কিন্তু আমি যতদুর জানি একজন পুলিশও মারা গেছে।
সেটাই কি স্বাভাবিক নয়?আর নজনের কাছে একজন!
মানে সংখ্যাটাই তোমার কাছে সব।খুনটা নয়।
রাষ্ট্রের পৈশাচিকতাকে দমন করতে গেলে মাঝে মাঝে রাষ্ট্রযন্ত্রটার গলা টিপে ধরতে হয়।
তার মানে তোমাদের খুনের পক্ষে সাফাই থাকবে,আর রাষ্ট্র যখন পাল্টা আঘাত হানবে তখন সেটা রাষ্টের বর্বরতা হয়ে যাবে,তাই তো?
সুজাতা,তুমি কি এটা সমর্থন করো?
আমি খুনোখুনিটাই সমর্থন করি না।
তার মানে তোমার পার্টির লাইনটা ভালোই আয়ত্ত্ব করেছ।
তোমার পার্টি মানে?তুমি পার্টির সদস্য নও?
কয়েকদিন আগে অব্দি ছিলাম।এখন আর নই।যারা বিপ্লবের সাথে বিশ্বাসঘতকতা করে তাদের আমি আমার কমরেড বলে মানতে পারি না।
তোমরা একটু বেশি অধৈর্য হয়ে পড়ছ বলে মনে হচ্ছে না?
অধৈর্য?হ্যা তা হয়তো হয়েছি।আরো আগে হওয়া উচিত ছিল।যখন তেলেঙ্গানার গণ আন্দোলনকে নির্বাচনের কথা মাথায় রেখে দমিয়ে দেওয়া হল তখনই অধৈর্য হওয়া উচিত ছিল।সংশোধনবাদি নেতৃত্ব ক্ষমতার ভাগ পাওয়ার লোভে মানুষের স্বাভাবিক ইচ্ছা আকাংখাকে যখন গলা টিপে হত্যা করে তখন বিপ্লবী পথ বেছে নেওয়াটাই পার্টির র্যাবডিকাল অংশের কাছে একমাত্র পথ হয়ে দাঁড়ায়।যেটা লেনিন করেছিল বলশেভিকদের মেনশেভিক দের থেকে আলাদা করে।
লেনিনের কথাই যখন তুললে তখন বলি,ওনার leftwing communism an infantile disorder নিশ্চয়ই পড়েছ।
ভালোই শিক্ষা পেয়েছ সংশোধনবাদিদের কাছ থেকে।কই ওনার state and revolution এর কথা তো বললে না।
অর্ক তুমি ভুল পথে চলেছ।এখনো সময় আছে বেরিয়ে এসো এখান থেকে।
কি হবে?তোমার পার্টি বহিষ্কার করবে তো তা নাহলে।আমি থোড়াই কেয়ার করি।আমি সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছি নতুন পার্টিতে জয়েন করব।তারপর পার্টির নির্দেশে যেখানে যেতে বলবে সেখানেই যাব।
আর আমার কি হবে অর্ক?আমি কি তোমাকে ভালোবেসে ভুল করেছি তাহলে?
সে তোমার সিদ্ধান্ত।আমি কি বলব।তুমি চাইলে আমার সাথে আসতে পারো।তবে তার আগে তোমার মনকে বিপ্লবী চেতনার উপযুক্ত করতে হবে।
কিন্তু আমি যে তোমাদের এই পথকে সমর্থন করতে পারব না।কারন আমি জানি এই পথ হঠকারীতার পথ।সত্যিকারের বিপ্লব কখনো এই পথে আসবে না।
সারা দেশ একটা বারুদের স্তুপ হয়ে রয়েছে।শুধু একটি মাত্র স্ফুলিঙ্গ দরকার।কমরেড চারু মজুমদার আমাদের এই স্ফুলিঙ্গের সন্ধান দিয়েছে।আমি আর পেছন ফিরে তাকাতে পারব না।
শেষ পর্যন্ত অর্ক মজুমদার,একজন অগ্রণী কমরেড,ব্যক্তিপূজা করতে শুরু করল!হাসালে অর্ক।
সুজাতা তুমি যাই বলো,যে পথের সন্ধান আমি পেয়েছি সেখান থেকে আমার আর পিছিয়ে আসা সম্ভব নয়।আমি জানি তুমি আমার সাথে আসবে না।তোমার ব্যাক্তিগত ইচ্ছেকে মর্যাদা দিয়েই আমি বলছি,স্বাধীন ভারতের কোন এক নতুন সকালে হয়ত তোমার সাথে আবার দেখা হবে।সেই দিনের অপেক্ষায় আমি থাকব।তারপর তোমার সব প্রশ্নের আমি জবাব দেব।
তুমি যেই দিন চাও,যে লাল টুকটুকে দিন চাও সেই দিনের সন্ধান তোমাদের এই হঠকারি পথ কখনই দেবে না অর্ক।
তোমাকে তো এখন আমি আর কমরেড বলে ডাকতে পারব না,বন্ধু বা ভালোবাসার মানুষ হিসেবেই বলি হে বন্ধু বিদায়।
একেই বলে আয়রনি অর্ক।সেই বুর্জোয়া কবির উক্তিই ধার করতে হল তোমাকে শেষ পর্যন্ত?
একটু হেসে অর্ক বিদায় নিল এক লাল টুকটুকে দিন আনার উদ্দেশ্যে।সুজাতা কিছুক্ষন তাকিয়ে রইল অর্কর গমনপথের দিকে।তারপর হাঁটা লাগাল সূর্য সেন স্ট্রীটের পার্টি অফিসের দিকে।
-
-
-
ভেঙ্কটেশের ইন্টারভিউটা হয়ে যাওয়ার পর একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল পরমা।অভিজিতকে ইশারা করে ক্যামেরা বন্ধ করতে বললতারপর ওনার দিকে তাকিয়ে পরমা বলল আমাদের ফর্মাল কাজ শেষ।এবার একটা ইনফর্মাল কাজ বাকি আছে।এটা অবশ্য আমার ব্যক্তিগত কাজ।
ভেঙ্কটেশ একটু অবাক হয়ে তাকাল রিপোর্টারটার মুখের দিকে।পরমা ওর সাইড ব্যাগ থেকে একটা নীল কভারের ডায়েরী বের করল।ভেঙ্কটেশের হাতে তুলে দিতে দিতে বলল,আমার মা সুজাতা মিত্রের এই ডায়েরীটা আমি মা মারা যাওয়ার পর আলমারি থেকে আবিষ্কার করি।আপনার ইন্টারভিউ নেওয়ার আগে আপনার সম্পর্কে যথেষ্ঠ হোমওয়ার্ক আমাকে করতে হয়েছিল।তাই আপনার পুরো ইতিহাসটাই আমি জানি।ডায়েরীটা পারলে পড়ে দেখবেন।
ভেঙ্কটেশ বললেন,তুমি সুজাতার মেয়েআমি প্রথমেই তাই তোমাকে দেখে একটু চমকে উঠেছিলাম।সুজাতা আর নেই?কি হয়েছিল ওর।
পরমা বলল দু হাজার দশে আপনাদের ভাষায় সোশাল ফ্যাসিষ্ট দলের যে জেলা কমিটির সদস্যাকে আপনাদের পশ্চিমবঙ্গের কমরেডরা গুলি করে খুন করেন তিনিই ছিলেন আমার মা সুজাতা মিত্র।