আশ্বিনের শারদপ্রাতে
"মনে আছে তোমার, ফুলশয্যার রাতে লাথি মেরেছিলে আমায়!" সৃজনীদেবীর দিকে তাকিয়ে আচমকা বলে
উঠলেন সাত্যকিবাবু। পেশায়ে প্রফেসর সাত্যকিবাবু বছর ছয়েক হয়েছে অবসর নিয়েছেন
কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। আজ হঠাতই পুরোনো অ্যালবাম দেখতে দেখতে স্মৃতির মণিকোঠা
থেকে একটা মুক্তো ঝরে পরলো।
"আমরন, মাঝরাতে একি
ন্যাকামি!" আকাশ থেকে পরলেন সৃজনীদেবী।
এক ঝলক বরকে দেখে নিয়ে বললেন "এই মাঝেরাতে
ধুলো ঘাঁটছো, এরপর হাঁচলে আমি কিন্তু সোজা তোমায়ে বের করে
দেব।" বলেই হজমের ওষুধের শিশির ঢাকনাটা চেটে নিলেন তিনি।
"আস্তে কথা বলো, পাশের ঘরে ছেলে, ছেলের বউ ঘুমাচ্ছে।" আহতগলায়ে কথাগুলো বলে
অ্যালবামটা মুড়ে ঢুকিয়ে ফেললেন সাত্যকিবাবু।
"তা তুমিই বা মাঝরাতে ঢঙ করছ কেন? উঠে হাত পা ধুয়ে শোও না। আদিখ্যেতা যত।" পুনরায় মুখ ঝামটা সৃজনীদেবীর।
কিন্তু এবার ভলিউমটা একটু আস্তে।
"হুম" হাত পা ধুয়ে এসে পাশ ফিরে শুয়ে পরলেন
সাত্যকিবাবু। মনটা বিষাদে ভরে গেছে। প্রত্যেক কথায়ে ঝগড়া করাটা সৃজনীর স্বভাব।
বিরক্ত লাগে আজকাল। আচ্ছা এই বয়েসে এসে ডিভোর্স চাওয়াটা কি সমীচীন? নাহ্, ৬ বছরের ছোটো নাতনিটার উপর কি প্রভাব পরবে। সে স্কুলে গিয়ে
বলবে আমার দাদান-ঠাম্মামের ডিভোর্স হয়ে গেছে, সে বিশাল লজ্জার ব্যাপার হয়ে যাবে। তার থেকে সন্নাসী হয়ে যাবেন। একা থাকতে
হলেই এই ভদ্রমহিলা বুঝবেন কত চালে কত ধান। ইয়ে মানে কত ধানে কত চাল। কথাটা ভেবেই
জিভ কাটলেন সাত্যকিবাবু। ভাগ্যিস জোরে বলেননি। জোরে বললেই আরেক প্রস্থ জ্ঞান বাঁধা
ছিলো কপালে। শুয়ে শুয়ে টের পেলেন পাশে বিশমণি লাশটা উঠলো, এবার রাজ্যের গল্প বলবে, চুপচাপ চোখ বুজলেন
সাত্যকিবাবু।
"এই জানো তো পাশেরবাড়ির বল্টুর বউটা না.... আরে
এই শোনোনা।" পাশে শুয়েই বলতে শুরু করলেন সৃজনীদেবী।
"বলি এই বুড়ো ঘুমোচ্চো?" ঝামটে উঠলেন সৃজনীদেবী।
সাত্যকিবাবুর কোনো শব্দ নেই।
গায়ে হাত দিয়ে একবার ঠেললেন "ঘুমোচ্চো!
"।
নাহ্ সাত্যকিবাবু ঘুমিয়ে পরেছেন। মুখটা বিকৃত
করে পাশে ফিরে চোখ বুজলেন সৃজনীদেবী। হঠাত অভিমানে গলাটা ব্যথা ব্যথা করতে লাগলো
সৃজনীদেবীর। আর কখনো সাত্যকির সাথে কথা বলবেন না তিনি। সত্যি ৩৬-৩৭ বছর হয়ে গেল
বিয়ে হয়েছে, কি পেয়েছেন তিনি এই বিবাহিত জীবনে? সবাই বলে শিবের মতো বর। আরে কেউ দেখতে গেছে শিব বর হিসেবে কেমন! সবকথায়ে হু
হাঁ, রসকষ নেই শরীরে। মাঝে মাঝে টিভির অ্যাডভার্টাইসগুলো দেখলে
মনে হয় খাইয়ে দেবেন ওষুধ। তাতে যদি হেলদোল আসে। চোখটা ভিজে এলো সৃজনীদেবীর। বিছানা
থেকে নেমে জানলার কাছে গিয়ে দাঁড়ালেন। দেখো, কোনো পরিবর্তন নেই। পাশ থেকে বউ যে উঠে গেল কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই। নিশ্চিন্তে
নাক ডাকছে। কেউ যদি বউকে চুরি করেও নিয়ে যায় তাও ঘুমাবে। বললে বলবে 'এই মাল আর কে নেবে!' চোখের জলটা আর বাঁধা
মানছে না। এখন মনে হয় শুরুর বছরগুলো কি আরামেই না কেটেছিল। প্রথমে ৭ বছরের দীর্ঘ
প্রেম, তারপর বিয়ে। তখন কত কথা রিটায়ারমেন্টের পর দোঁহে মিলে ঘুরতে
যাবো, আর আসলে কি হচ্ছে, ঘরের মধ্যে
পিষছে। গত ৩-৪ বছর পুজোতেও বেরোনো হয়না।
জানলাটা খুলে দিলেন সৃজনীদেবী। আকাশটা লাল হয়ে
আছে। বৃষ্টি হবে মনে হয়। তা হোক, এখন হয়ে যাক, পুজোয়ে না হলেই হলো। যা গরম ছুটেছে। আশ্বিন পরে গেলো, কিন্তু ঠান্ডার আমেজটা আসেনি এখনো। রোজই প্রায় এ.সি. চালাতে হচ্ছে। বাবুর আবার
ঠান্ডার ধাঁত।
হঠাতই কোমরে হাতের স্পর্শ পেলেন সৃজনীদেবী।
পিছন থেকে ভরাট গলা বলে উঠলো "ঘুম আসছে না?" মনটা ভরে গেল সৃজনীদেবীর। যাক টের পেয়েছে। চুপ করে থাকলেন তিনি। "একি
চোখে জল!" আবার বললো ভরাট কন্ঠ।
ইশ মাঝেরাতে ঢঙ দেখ মিনসের। সৃজনীদেবীকে বুকে
টেনে নিলেন সাত্যকিবাবু। অভিমানী সৃজনীদেবীর মধ্যে তখন নতুন বউয়ের লজ্জা।
বরের বুকে মুখটা গুঁজে হেসে ফেললেন তিনি।
"মনে আছে, ফুলশয্যা রাতে কানও মুলে দিয়েছিলাম।"
"হ্যাঁ লাল হয়ে গেছিল কানটা।" সাত্যকিবাবু
বললেন।
"আর সেই জন্যে বারবার আমার গাল টিপে টিপে লাল
করে দিচ্ছিলে।" লজ্জায়ে লাল হয়ে গেছেন সৃজনীদেবী।
সৃজনীদেবীর চোখটা মুছিয়ে কপালে ঠোঁট ঠেকালেন
সাত্যকিবাবু।
আচমকাই সশব্দে হেসে উঠলেন সৃজনীদেবী।
-"কি হলো?"
-"কিছু না।"
-"না বলো।"
-"বললাম তো, কিছু না।" তখনও হাসছেন সৃজনীদেবী।
-"ছাড় বলতে হবেনা।" আহত কন্ঠে বললেন
সাত্যকিবাবু।
"বাবু হওয়ার পর, নার্সিংহোমে ঢুকেই তুমি প্রথম আমায়ে বলেছিলে ব্যস এই একটাই বাচ্চা, আর না। এভাবে আমায়ে দেখতে কষ্ট হচ্ছে তোমার।" গভীরভাবে সাত্যকিকে জড়িয়ে নিলেন
সৃজনীদেবী।
হেসে ফেললেন সাত্যকিবাবুও। খানিক চুপচাপ
দুজনেই। বাইরে বৃষ্টিটা নামছে আস্তে আস্তে।
নীরবতা ভেঙ্গে মুখ খুললেন সৃজনীদেবী। "কাল
তো মহালয়া, আমায়ে কাল বেড়াতে নিয়ে যাবি সতু?" আজ এত বছর পরে, আবার সেই পুরোনো সম্মোধন ঠোঁটে আসছে
সৃজনীদেবীর।
"বেড়াতে? না বেড়াতে যাব না। তার চেয়ে ঘরে বসে গঙ্গার তর্পণ দেখব কাল সারাদিন।"
স্ত্রীকে বাহুপাশ থেকে মুক্ত করলেন সাত্যকিবাবু।
ঝংকার দিয়ে উঠলেন সৃজনীদেবী। "ছাড় তো,
ন্যাকামি বাদ দাও। শুতে চলো। মহালয়া শুনতে হবে ভোরে
উঠে।" বিরক্ত কন্ঠে বলে উঠলেন সৃজনীদেবী।
স্ত্রী কে আটকাতে গিয়েও আটকালেন না
সাত্যকিবাবু। জানলার দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসলেন শুধু। কান ফাটানো শব্দে আওয়াজ উঠলো 'কড় কড় কড়াত'।
"ও মাগো!" চমকে উঠে সাত্যকিবাবুকেকে জাপটে
ধরলেন সৃজনীদেবী।
নিজের 'সৃ' কে আরো একবার বুকের মধ্যে টেনে নিতে নিতে 'সতু' বললেন "কোথায়ে যাবি বল?"
পাশে ছেলে ছেলের বউয়ের ঘর থেকে বেজে উঠলো
"আশ্বিনের শারদপ্রাতে বেজে উঠেছে........"
No comments:
Post a Comment