Sunday, 10 July 2016

এক মজার গল্প


বছর ১৬ আগের একটা দিনমার্চের শেষের দিক, আমার তখন ছেলেবেলা। পিছুটানহীন, প্রত্যাশাহীন, চাপহীন সেই স্বর্ণযুগ। দ্বিতীয় শ্রেণীর হাপিয়ালি পরীক্ষা হয়ে গিয়েছে, এবার অ্যানুয়ালি পরীক্ষা কোমর বেঁধেছে। আসবে আসবে করছে। তাই জোরকদমে ফাঁকি মারা চলছে আর চলছে ক্রিকেটের কিছু নতুন নিয়ম শেখা। মাঠের ধারে ওই বেড়াটার ওপারে বল গেলে আউট, কেননা ওদিকে ওই পাকানো গোঁফওলা রাগী দাদুটা থাকে। উইকেট যার সে উইকেটকিপার, ব্যাট যার সে আগে ব্যাট পাবে। বল যে হারাবে সে টিম থেকে বাদ। ইত্যকার গুরুত্বপূর্ণ ও প্রয়োজনীয় নিয়মগুলো ঝালিয়ে নেওয়া হচ্ছে।
যাইহোক, ক্রিকেট বাদেও আমাদের ছোটোবেলায় আরেকটা প্রিয় খেলা ছিল। 'ক্যালেন্ডার- ক্যালেন্ডার' খেলা। নানা, মেরে দেওয়ালে ক্যালেন্ডার করে লটকে দেওয়া নয়, আসলি ক্যালেন্ডার নিয়ে আচ্ছাসে মুখস্ত করে নেওয়া কোন কোন বারে কি কি কারণে কদিন ছুটি। তারপর তা থেকে অন্যজনকে পরীক্ষা! শুধু বলে দিলেই হবেনা, তার উপর ওইসব দিনগুলোতে ছুটি কেন থাকবে সেটাও ব্যাখ্যা করতে হত! তাতে প্রতিপক্ষ সহজে ঘায়েল না হলে তখন তাকে বার আর মাসের ইংরাজি নাম আর বানান বলতে হবে। এরপরেও যদি অন্যজন জিতে যেত, তখন আর কি! মনখারাপ করে বাড়ি।
সুতরাং, বাড়িতে কোনোরকমে নতুন ক্যালেন্ডারের অনুপ্রবেশ ঘটলেই ছুটে গিয়ে তা অধিগ্রহণ করতে হত। আকারে তা তখনো আমার চেয়ে বেশ বড়, তাই তারপর বিছানাতে বা মেঝেতে তাকে ভুলুন্ঠিত করে তার বুকের উপর চড়ে বসে একমনে মুখস্ত করা, আর আগত দিনের কথা ভেবে উৎফুল্ল হয়ে ওঠা! আগাম প্ল্যান!
এরকমই একদিন ক্যালেন্ডার মুখস্তপর্ব চলাকালীন এক ক্ষমাহীন অপরাধ চোখে পড়ায় ক্যালেন্ডার বগলদাবা করে সোজা বাবার দরবারে। আচ্ছা, ক্যালেন্ডার ছাপে কারা? ছিঃ!! কিচ্ছু পড়াশোনা শেখেনি!! এক্ষুণি বাবাকে না জানালে চলছেই না!!
বাবা শুনেই বললো, "গাধা! কই ঠিকই তো আছে! ২০০০ সাল যে লিপইয়ার জানিস না? ফেব্রুয়ারিতে ২৯ দিন তো হবেই। চার বছর অন্তর অন্তর ফেব্রুয়ারিতে একটা দিন যোগ হয়, সেদিনই তো শেখালাম রে! এখানে ছাপায় কোনো গণ্ডগোল নেই! এত বড় হয়ে গেলি আর এইটা শিখলি না? সারাদিন খেলে বেড়ালে আর কি হবে? কদিন পরেই পরীক্ষা, আর খেলতে না গিয়ে পড় এবার একটু। যা!!"
বিরসবদনে ফিরে এলাম। ইস্কুলে গিয়ে দেখি অফিসের সামনে দ্বিতীয় শ্রেণীর এক জটলা। ভাবলাম ওই সন্দেহজনক ফেব্রুয়ারির ২৯টা সবার নজরে পড়েছে! বটেই তো! হলই বা লিপ ইয়ার, তা বলে একটা দিন এক্সট্রা দেবে কেন?
কিন্তু যা শুনলাম তা এর চেয়েও মজার! স্কুলে ১লা এপ্রিল ছুটি দেয়নি। সেদিনই আবার কালান্তক অঙ্ক পরীক্ষা! সাথে সাথে মনে পড়ে গেল ১লা এপ্রিল তো লালকালির দাগ দেখেছি!! কি সব চলছে চারিদিকে! ক্যালেন্ডার কোম্পানিকে চিঠিটা না লিখলেই নয়!! কয়েকটা বন্ধুও দেখলাম একই কথা বলল।
যথাসময়ে ক্লাস আরম্ভ হল। শেষ ও হল। আমি বেশ গম্ভীর মুখে দিদির মুখের দিকে তাকিয়ে!
- কিরে, শুভ, কিছু বলবি?
- দিদি একলা এপ্রিল অঙ্ক পরীক্ষা!
- একলা নয়, পয়লা বলতে হয়! তোর কি ভয় করছে?
- না দিদি! ওইদিন তো পরীক্ষা হওয়া উচিত নয়!!
- সেকিরে! কেন??
সাথে সাথে আরও চারপাঁচজন হল্লা করে উঠলো। দিদি বাধ্য হয়ে আমার টিনের সুটকেসটাতে আরেকবার বাজিয়ে বললেন - একে একে বল!!!
অগত্যা আমিই বিষয়টা খুলে বললাম। "না দিদি, ওইদিন তো ছুটির দিন! বাব্যাহি আছে!! পরীক্ষা দিয়েছে কেন?"
- সেটা কি বস্তু!!??
ও কিচ্ছু জানে না দিদি! বাব্যাহি নয়! বাঃ-ব্যাঃ-হিঃ আছে!!
- কিসব ভুলভাল বলছিস! ওটা আবার কি জিনিস!!
- দিদি,মনে হয় ওটা জৈনদের উৎসব! ক্যালেন্ডারে দেখেছি হিন্দু, মুসলিম,খ্রিস্টান, শিখ এমনকি বৌদ্ধদের ও উৎসব আছে। ওরা এই বছরে কিছু পায়নি, তাই ক্যালেন্ডার কোম্পানি ওদের দুদিন ছুটি দিয়েছে। তার পরেই ২ এপ্রিল দেখুন মহাবীর জয়ন্তী আছে! ওইদিন অঙ্ক পরীক্ষা কেন??
দিদি সাধারণত গম্ভীর। হঠাৎ হাহা করে হেসে উঠে বললেন, আরে, বাঃ ব্যাঃ হিঃ কোনো উৎসব নয় রে! ব্যাঙ্কের বাৎসরিক হিসাব হবে ওইদিন!! ব্যাঙ্ক বন্ধ। স্কুল নয় রে!! হাহা!!!
যারা এতক্ষণ আমার হয়ে লড়ছিল,তারাই দেখি হাহা করে হাসছে!! ব্যাঙ্ক!! ওই যেখানে গেলে জালের ওপারে বসে থাকা কাকীমারা মাকে হাত বাড়ালেই একগাদা টাকা দেয়?কিন্তু মায়ের দেখাদেখি আমিও তো হাত বাড়িয়েছিলাম, আমাকে একটা টাকাও দেয়নি!! ওরা বাজে! ওদের কেউ ছুটি দেয়!! ছিঃ!!
কি আর বলবো! ভারী বাজে হয়ে যাচ্ছে সবাই।

No comments:

Post a Comment